ঢাকা বুধবার, ৫ই অক্টোবর ২০২২, ২১শে আশ্বিন ১৪২৯


মাছ-মুরগীর বিজ্ঞান সম্মত খামারে সাফল্য


২৬ আগস্ট ২০২২ ১৭:৪৮

ছবি- সংগৃহিত

খুলনার রূপসা থানার অবহেলিত গ্রাম ছিল জাবুসা। উপজেলার ৩ নং নৈহাটি ইউনিয়নের এই গ্রামে জোয়ারের লোনা পানিতে প্লাবিত হয়ে, জমিতে ফসল কম হতো। ফলে দারিদ্রতা ছিল ওই এলাকার মানুষের নিত্য সঙ্গী। এই গ্রামে আধুনিক ও বিজ্ঞান সম্মত পদ্ধতিতে মৎস্য চাষ নতুন এক সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। গ্রামে তানভীর ফিসারিজ নামে একটি খামারের মাধ্যমে রেনু পোনা থেকে শুরু করে বাগদা, গলদা চিংড়ির পাশাপাশি সাদা মাছ তথা রুই, কাতল, মৃগেল, কালিবাউস, সিলভারকার্পসহ বিভিন্ন কার্প জাতীয় মাছ ছাষ হয়। এতে ধীরে ধীরে বদলে যেতে থাকে গ্রামের আর্থ সামাজিক চিত্র।

জাবুসা গ্রামের বাসিন্দা রবিউল ইসলাম লিটু বলেন, তানভীর ফিসারিজ মৎস্য চাষ শুরুর পর গ্রামের নতুন সম্ভবনার দুয়ার খুলেছে। জোয়ারের লোনা পানির কারনে যেসব জমিতে ফসল হতো না, এখন ওই সব জমিতে হচ্ছে কোটি কোটি টাকার সাদা সোনা বা চিংড়ি। আর সাদা মাছাতো আছেই। অত্যাধুনিক পদ্ধতিতে মাছ চাষ করায় এলাকার গরিব মানুষ সেখানে কাজ করে তাদের অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটিয়েছে। মানুষ এখানে কাজ করার পাশাপাশি তাদের দেখাদেখি আরও নতুন নতুন খামার গড়ে তুলেছে।

জাবুসা গ্রামের নৈহাটি ইউনিয়নের ৩ নং ওয়ার্ডের ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার মো. বাবর আলী বলেন, তানভীর ফিসারিজে চিংড়ি ও সাদা মাছ চাষ করে ব্যাপক সফল হয়েছে। এই এলাকার বহু মানুষ এখানে রোজ ও মাস হিসেবে কাজ করে সাবলম্বী হয়েছে। তানভীর ফিসারিজের দেখাদেখি আরও বহু মানুষ মাছ চাষে উদ্যোগী হযেছে। এলাকার বেকার ঘুরে বেড়ানো ছেলে মেয়েরা মাছ চাষ করে এখন সাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি আর্থিকভাবেও ব্যাপক সমৃদ্ধ হয়েছে। তারা এলাকায় ব্যাপক পরির্তন এনেছে। আমি ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে তাদেরকে সব ধরনের সহযোগিতা দিয়ে আসছি।

ওই এলাকার বাসিন্দা এস এম আসাফ-উদ-দৌলা বলেন, তানভীর ফিসারিজ গ্রামে আসায় আমরা বেশ উপকৃত হয়েছি। তারা ১০/১২ বছর থেকে এখানে আধুনিক প্রযুক্তিতে সফলভাবে মাছের চাষ করে এলাকার আর্থসামাজিক উন্নয়ন ঘটিয়েছে। শুধু জাবুসা নয়, রূপসার ৩ নং নৈহাটি ইউনিয়নের আরো একাধিক গ্রাম ও ২ নং শ্রীফলতলা ইউনিয়নে মাছ ও ফোল্ট্রি ফার্ম করে ব্যাপক সফলতা পেয়েছে তানভীর ফিসারিজ ও তানভীর পোল্ট্রি ফার্ম। এই ফার্মের উদ্যোগতা বিশিষ্ট শিক্ষানূরাগী ও প্রকাশনা সংস্থার ব্যাবসায়ী আলহাজ¦ মোহাম্মদ আবু সাঈদ। তার ঐকান্তিক চেষ্টায় দিনে দিনে বদলে যেতে থাকে গ্রামগুলোর চিত্র।

জাবুসার সেলিম মিয়া বলেন, তানভীর ফিসারিজ ও পোল্ট্রির কারনে বেকার ছেলে মেয়েদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। তাদের সংসারে অভাব অনটন দূর হয়েছে। এখানকার উৎপাদিত মাছ এলাকার চাহিদা মিটিয়ে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্নস্থানে পাঠানো হচ্ছে। উৎপাদিত চিংড়ি বিদেশেও রপ্তানী হচ্ছে। জাবুসা গ্রামের স্থানীয় মসজিদের ইমাম হাফেজ ক্বারী মাওলানা মো. সৈয়দ ওসমান গনি বলেন, তানভীর ফিসারিজ এলাকায় মাছ চাষ শুরুর পর আমুল পরিবর্তন হয়েছে। ঘেরতো বহু মানুষই করে কিন্তু তানভীর ফিসারিজ যেভাবে আধুনিক ও উন্নত প্রযুক্তিতে মাছ চাষ করছে তাতে তারা বেশ সফল হয়েছে। তারা সুন্দর পরিবেশে বিষমুক্ত ফিড দেওয়ার মাধ্যমে মাছ চাষ করছে। এলাকার মানুষ তাদের এই উন্নত প্রযুক্তিতে মাছ চাষ দেখে শিক্ষা নিয়ে নিজেরাও মাছ চাষে সফল হচ্ছে।

তানভীর ফিসারিজের ম্যানেজার জাকির হোসেন বলেন, আমাদের প্রকল্পে দিনে দুইবার জোয়ারের পানি আসে। জোয়ার ভাটার কারনে প্রকল্পে মাছ চাষে বেশ সফলতা এসেছে। পাশাপাশি আমরা আধুনিক পদ্ধতিতে গলদা, বাগদা ও হরিনা চিংড়ি চাষ করি। যা বিদেশেও রপ্তানী হচ্ছে।

রূপসা উপজেলার সহকারী মৎস কর্মকর্তা মো. লিয়াকত আলী বলেন, আধুনিক ও উন্নত প্রযুক্তিতে মাছ চাষ করলে মাছের উৎপাদন কয়েকগুন বেড়ে যায়। এরা সেটাই করছে। আমরা বিষয়টি সব সময় পর্যবেক্ষন করছি এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছি। এই খামারাটিকে আমরা একটি মডেল খামার বলতে পারি।
এভাবে মাছ চাষ করলে আশা করছি এলাকার আর্থ সামাজিক অবস্থা আরও উন্নত হওয়ার পাশাপাশি এলাকায় প্রানীজ আমিষের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও প্রচুর মাছ রপ্তানী করে প্রচুর পরিমান বৈদেশি মুদ্রা আয় করা সম্ভব। স্থানীয় যারা জমির লিজ দিয়েছেন মাছ চাষের জন্য তারাও তানভীর ফিসারিজের সফলতা দেখে দারুনভাবে মুগ্ধ হয়েছেন।

এদিকে শ্রীফলতলার বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে তানভীর পোল্ট্রির শেড। এখানে বয়লার, লেয়ারসহ বিভিন্ন ধরনের মুরগী উৎপাদন হয়। কোন রকম এন্টিবায়োটিক ছাড়া এসব খামারে মুরগী ও ডিম উৎপাদন করা হচ্ছে। ২ নং শ্রীফলতলা ইউনিয় পরিষদের সদস্য জাঙ্গীর আলম বলেন, তানভীর পোল্ট্রি ফার্মের কারনে এলাকার বেকার ছেলে-মেয়েদের কর্মসংস্থান হয়েছে। তারা দৈনিক ও মাস ভিত্তিতে এসব খামারে কাজ করছে। আমি তাদেরকে সবধরনের সহায়তা করছি। তাদের দেখাদেখি আরও অনেকে এলাকায় পোল্ট্রি ফার্ম করেছে।

উপজেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা ডা. প্রদীপ কুমার মজুমদার বলেন, পোল্ট্রি ফার্মগুলো উন্নত ও বিজ্ঞান সম্মম প্রযুক্তি ব্যবহার করে মুরগী চাষ করে প্রাণীজ আমিষের চাহিদা মিটছে। আমরা উপজেলা প্রাণী সম্পদ দপ্তরের মাধ্যমে তাদের খামারগুলো নিয়মিত পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি সবসময় টিকাসহ প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সযোগিতা দিয়ে আসছি। তারা সে অনুযায়ী কাজ করছে। যার মাধ্যমে আত্মকর্ম সংস্থান তৈরি হচ্ছে। আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন ছিল ক্ষুধা ও দারিদ্র মুক্ত দেশ গঠন। সে লক্ষ্যে তানভীর ফোল্ট্রি খুলনা জেলার রূপসা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে বিজ্ঞান সম্মত উপায়ে খামার পরিচালনা করে যাচ্ছে। আমি তাদেরকে সাধুবাদ জানাই।

তানভীর পোল্ট্রি ফার্মের ম্যানেজার মো. আসাদুজ্জামান বলেন, এলাকায় তানভীর পোল্ট্রি ফার্মের কারনে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। এলাকার চাহিদা মিটিয়ে পদ্মা সেতু হওয়ায় দ্রুত এসব পণ্য রাজধানী ঢাকায় পাঠানো যাচ্ছে।


মৎস্য চাষ, ফিড, হ্যাচারি, ঘের, খুলনা, নৈহাটি, জাবুসা, রেনু পোনা