জামায়াতের সাবেক থানা আমির প্রিসাইডিং কর্মকর্তা, রাতেই ‘ব্যালটে সিলের’ অভিযোগ তুলে উত্তেজনা
নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে একটি ভোটকেন্দ্রে নির্বাচনী কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় জামায়াতের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ‘ব্যালটে সিল’ দেওয়ার অভিযোগ করেছেন বিএনপির প্রার্থী।
যদিও জামায়াতের পক্ষ থেকে এ অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে।
এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে আজ বুধবার রাতে নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সিদ্ধিরগঞ্জ অঞ্চলের গোদনাইলের ধনকুন্ডা পপুলার হাই স্কুল কেন্দ্রে উত্তেজনাও দেখা দেয়।
ভোটকেন্দ্রে উত্তেজনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে কেন্দ্রের ভোটকক্ষের মেঝেতে ব্যালট ছড়িয়ে পড়া দেখা যায়।
মুঠোফোনে দ্য ডেইলি স্টারকে কেন্দ্রটির দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রিসাইডিং কর্মকর্তা মো. বশিরুল হক ভূঁইয়া বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে বিএনপির লোকজন সিনক্রিয়েট করছে।’
এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধেই জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করেছেন বিএনপির প্রার্থী আজহারুল ইসলাম মান্নান।
প্রিসাইডিং কর্মকর্তা মো. বশিরুল হক ভূঁইয়া জামায়াতে ইসলামীর সিদ্ধিরগঞ্জ থানা শাখার আমির ছিলেন বলেও নিশ্চিত করেছেন দলটির নারায়ণগঞ্জ মহানগরের আমির মাওলানা আবদুল জব্বার।
ধানের শীষের প্রার্থী ভাষ্য, ‘কেন্দ্রটির প্রিসাইডিং কর্মকর্তা জামায়াতে ইসলামীর নেতা। তার সহযোগিতায় কেন্দ্রের ভেতর রাতের বেলায় ব্যালট পেপার খোলা হয়েছে এবং তাতে সিল মারারও প্রস্তুতি নিয়েছিল দলটির নেতাকর্মীরা।’
মুঠোফোনে কথা বলার সময় দলীয় পরিচয় ও অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কল কেটে দেন প্রিসাইডিং কর্মকর্তা বশিরুল হক ভূঁইয়া।
পরে আরও কয়েকবার কল করা হলেও তিনি আর তা রিসিভ করেননি। কেন্দ্রটিতে সরেজমিনে গিয়েও তার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পাওয়া যায়নি।
তবে, এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আসনটিতে জামায়াতের প্রার্থী ইকবাল হোসেন ভূঁইয়া। তিনি মুঠোফোনে বলেন, ‘কোনো কেন্দ্রে এ ধরনের ঝামেলা হয়েছে কিনা তা শুনিনি। আর ওই নামে আমাদের কোনো নেতা আছেন কিনা তাও জানা নেই।’
নারায়ণগঞ্জ মহানগরের আমির মাওলানা আবদুল জব্বার বলেন, ‘মিথ্যা তথ্য দিয়ে গুজব ছড়িয়ে মব সৃষ্টি করা হচ্ছে। এটি কাম্য নয়।’
খবর পেয়ে ধনকুন্ডা পপুলার হাই স্কুল কেন্দ্রে যান সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা, পুলিশ সদস্য ও সেনা কর্মকর্তারা। কেন্দ্রটির ভেতরে সাংবাদিক ও সাধারণ মানুষের প্রবেশ ছিল নিষেধ।
বেশ কিছুক্ষণ পর বেরিয়ে এসে সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা শাহীনা ইসলাম চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, ‘নির্বাচনের আগে যেসব কাজ করতে হয়, তারা সেগুলোই করছিল। ভোটার তালিকা অনুযায়ী ব্যালটের সংখ্যা ঠিক আছে কিনা মিলিয়ে দেখতে হয়। এখানে বাইরের কেউ ছিল না। এখানে দলীয় কোনো আলোচনা হচ্ছিল না। আমি বিষয়টি ভালোভাবে যাচাই করে দেখেছি।’
প্রিসাইডিং অফিসারের জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা নিয়ম অনুযায়ী তাকে প্রিসাইডিং অফিসার হিসেবে নিয়োগ দিয়েছি। তিনি আমাদের কাছে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক। রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার কোনো প্রমাণ আমরা পাইনি। তিনি অনৈতিক কোনো কাজও করেননি। আমরা ভোটার তালিকা ও ব্যালট পেপার সবকিছু পরীক্ষা করেছি।’
মুঠোফোনে জানতে চাইলে একই ব্যাখ্যা দিয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা জেলা প্রশাসক রায়হান কবির বলেন, ‘ভেতরে ব্যালটে সিল দেওয়া হচ্ছে—এমন একটা রিউমার থেকে স্থানীয় লোকজন ও বিএনপির নেতাকর্মীরা জড়ো হন কেন্দ্রের সামনে। তারা কেউ কেউ ঢুকেও পড়েন। কিন্তু বিষয়টা তেমন না। নরমাল প্রসিডিউর অনুযায়ী তিনি ব্যালট পেপারগুলো বিভিন্ন কক্ষের জন্য সংখ্যা অনুযায়ী আলাদা করছিলেন।’
প্রিসাইডিং কর্মকর্তার জামায়াত-সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ প্রসঙ্গে রিটার্নিং কর্মকর্তা বলেন, ‘তার সঙ্গে জামায়াতের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি থাকতে পারে। কিন্তু আমরা তাকে নিয়োগ দিয়েছি স্কুল শিক্ষক হিসেবে। তাছাড়া, আজকের আগ পর্যন্ত তার বিষয়ে এমন অভিযোগ আমরা পাইনি।’
মহানগর যুবদলের সাবেক আহ্বায়ক মমতাজউদ্দিন মন্তু দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আমরা ৭টার দিকে এজেন্টদের তথ্য দিতে কেন্দ্রে ঢুকি। মূলত প্রিসাইডিং কর্মকর্তাই আমাদের এ সময়ে আসতে বলেছিলেন। ভেতরে ঢুকে দেখি, সব ব্যালট ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এবং সরকারি কর্মকর্তাদের বাইরেও জামায়াতের লোকজন সেখানে ছিল। তাদের সম্পর্কে জানতে চাইলে চার-পাঁচজন দৌঁড়ে বেরিয়েও যান। তখন আমাদের সন্দেহ বাড়ে এবং প্রশাসনে খবর দেই।’
