ঢাকা শুক্রবার, ১৯শে জুলাই ২০১৯, ৫ই শ্রাবণ ১৪২৬


নারী-শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে প্রযুক্তি


১১ জুলাই ২০১৯ ১০:২৬

আপডেট:
১৯ জুলাই ২০১৯ ১০:৩১

নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ আজ বিশ্বের রোল মডেল। তবে এটি অস্বীকার করার উপায় নেই- আমাদের সমাজে এখনও নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা বিদ্যমান। দৈনিক পত্রিকার পাতা খুললেই আমরা দেখতে পাই, কোনো না কোনো নারীকে যৌন নিপীড়নের শিকার হতে হচ্ছে। বয়স এখানে কোনো বিবেচ্য নয়। শিশু থেকে বৃদ্ধা; কারোরই যেন এই নিপীড়নের হাত থেকে রেহাই নেই। নারী হয়ে জন্মেছে সে, এটাই যেন তার অপরাধ। বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেনের 'দীপান্বিতা' উপন্যাসের মূল চরিত্র সুনীতি। তার কুমারীত্ব নষ্ট করেছিল তারই সহযাত্রী সহকর্মী মিহির। রাতের বেলা একাকী রাস্তায় কোথায় সহকর্মী নারীর বিপদে পাশে দাঁড়াবে। কিন্তু না! সুযোগ পাওয়ামাত্রই তার লালসা চরিতার্থে দ্বিধা করে না। বাধা কোনো কাজে আসে না, বল প্রয়োগে পরাস্ত হয় সুনীতি। পরিচিত নৌকার মাঝিরও একই চেহারা। সুনীতিকে সুরক্ষা না দিয়ে একই কায়দায় নিজেকে তৃপ্ত করে। এটি শুধু সেলিনা হোসেনের উপন্যাসের একটি খণ্ডচিত্র নয়; নারী নিপীড়নের এই বাস্তব নগ্ন রূপ সমাজসচেতন বিভিন্ন লেখকের গল্প-উপন্যাসে চিত্রিত। এ অবস্থার নিরসন হওয়া উচিত। ঘরে-বাইরে নারীর নিরাপদ থাকার একটা উপায় বের করাই এখন জরুরি।

গত ১৬ জুন একটি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত নারীর নিরাপত্তা ও সুরক্ষায় 'ডিজিটাল অ্যাপস ইচ্ছে ডানা' কলামটির প্রতি আমার দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়। ১৫ জুন ২০১৯ রবি টেলিকম তাদের গুলশানস্থ করপোরেট অফিস থেকে রাস্তায় চলাচলরত নারীদের সুরক্ষা প্রদানের লক্ষ্যে অ্যাপসটির উদ্বোধন করে। সেবাটি পাওয়ার জন্য ব্যবহারকারীকে *৫৫৫# ডায়াল করতে হবে। ইচ্ছে ডানা ব্যবহারকারীরা প্রতি মাসে দু'বার ১০ মিনিট করে ফ্রি ইমারজেন্সি মিনিট পাবেন, যার সাহায্যে জরুরি প্রয়োজনের সময় তার নিকটতম আত্মীয় বা বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে তিনি যোগাযোগ করতে পারবেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৪ সালের ৮ মার্চ টোল ফ্রি হেল্পলাইন '১০৯' জরুরি সেবার উদ্বোধন করেন। ইতিমধ্যে নির্যাতনের শিকার অনেক নারী ও শিশু এই জরুরি সেবা থেকে সেবা পেয়েছেন। ফোনকল পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের জরুরি সেবা দেওয়ার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। 'জয়' মোবাইল অ্যাপসের উদ্বোধন হয় ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি এমপি অ্যাপসটির উদ্বোধন করেন।

জয় মোবাইল অ্যাপসের পরিচিতি : জয় মোবাইল অ্যাপস একটি ডিজিটাল অ্যাপ্লিকেশন সফটওয়্যার। নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা নিরসন এবং নারীদের যৌন নির্যাতনের হাত থেকে সুরক্ষা দেওয়ার লক্ষ্যে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে মিটিং করে একটি উপায় বের করতে চায়। এরই ধারাবাহিকতায় এ মন্ত্রণালয়ের নারী নির্যাতন প্রতিরোধকল্পে মাল্টি সেক্টোরাল প্রোগ্রাম এবং তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের এটুআই প্রোগ্রামের যৌথ প্রয়াসে 'জয়' মোবাইল অ্যাপসটির উদ্ভাবন। এই অ্যাপসের কার্যকর প্রয়োগের মাধ্যমে নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুদের তাৎক্ষণিক সেবা প্রদানের মাধ্যমে সহিংসতা কমিয়ে আনা সম্ভব।

লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য :জয় মোবাইল অ্যাপস উদ্ভাবনের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের মধ্যে রয়েছে জেন্ডার সমতাভিত্তিক সুরক্ষিত সমাজ নিশ্চিতকরণ, নারীর ক্ষমতায়নসহ তাদেরকে উন্নয়নের মূল স্রোতধারায় সম্পৃক্তকরণে ডিজিটাল সেবা তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া। নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে সামাজিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলাসহ জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা।

জয় মোবাইল অ্যাপসটির বিশেষত্ব :জিপিএসের সাহায্যে ঘটনাস্থলের সঠিক অবস্থান শনাক্ত করার মাধ্যমে ভিকটিমকে তাৎক্ষণিক প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের ব্যবস্থা- অপরাধী শনাক্তকরণ ও অপরাধ প্রমাণে তথ্যপ্রমাণ সংরক্ষণে নির্ভরযোগ্য ভূমিকা রাখা। ১. এটি সপ্তাহে ৭ দিন ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকে; অ্যাপস ব্যবহারকারীরা বিনা পয়সায় এই সেবাটি পেয়ে থাকেন; ২. অ্যাপসের মাধ্যমে প্রাপ্ত অভিযোগ কয়েকটি নির্দিষ্ট সার্ভারে সংরক্ষিত হয় এবং একটি ড্যাশ বোর্ডের মাধ্যমে পরিচালিত হয়; ৩. অ্যাপস থেকে ধারণকৃত ছবি এবং অডিও শুধু জয় মোবাইল অ্যাপস সেন্টার থেকে দেখা যায় এবং এ ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীর তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা করা হয়।

সম্মিলিত প্রয়াস :মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাল্টি সেক্টোরাল প্রকল্পের মাধ্যমে জয় মোবাইল অ্যাপস সেন্টারে কর্মরত কর্মকর্তাদের জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা ও মানবাধিকারের ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়ায় তারা দক্ষতার সঙ্গে এ সিস্টেমটি অপারেট করতে সক্ষমতা অর্জন করেছেন। এ ছাড়াও জয় মোবাইল অ্যাপসের কার্যকর প্রয়োগে তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ ও বিটিআরসির সহায়তায় বাংলাদেশের মোবাইল টেলিফোন কোম্পানিগুলোর সঙ্গে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের চুক্তি স্বাক্ষর হয়। কোম্পানিগুলো তাদের করপোরেট সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটি হিসেবে নারী ও শিশু নির্যাতন বন্ধে জরুরি সেবা '১০৯' এবং 'জয়' মোবাইল অ্যাপস ব্যবহারকারীদের টোল ফ্রি সেবা দিতে সম্মত হন। সপ্তাহে ৭ দিন ২৪ ঘণ্টা এই টোল ফ্রি সেবা প্রদানের সুযোগ থাকার ফলে ঘরে-বাইরে নির্যাতনের শিকার বা নির্যাতনের আশঙ্কা রয়েছে এমন নারী বা শিশুকে তাৎক্ষণিক জরুরি সেবা প্রদানের মাধ্যমে এই অ্যাপসটি কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়।


ব্যবহার পদ্ধতি :নির্যাতনের শিকার হতে যাচ্ছে বা হয়েছে এমন কোনো নারী কিংবা শিশু জয় মোবাইল অ্যাপসের জরুরি অবস্থা বাটনে প্রেস করলে তাৎক্ষণিক নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে ন্যাশনাল হেল্পলাইন '১০৯', জেলা পর্যায়ে পুলিশ সুপার ও মেট্রোপলিটন এলাকায় উপ-পুলিশ কমিশনার এবং অ্যাপসে প্রদত্ত তিনটি এফএনএফ নম্বরে মেসেজ চলে যাবে। একই সঙ্গে জয় মোবাইল অ্যাপসের সার্ভারে প্রমাণ হিসেবে এচঝ লোকেশন, অডিও এবং ছবি সংরক্ষিত থাকবে। ব্যবহারকারী এ সময় অনলাইনে থাকলে, প্রমাণ হিসেবে প্রেরিত তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে অ্যাপসের নির্ধারিত সার্ভারে সংরক্ষিত হবে। ফলে বিপদে আক্রান্ত নারী ও শিশুদের তাৎক্ষণিক সহায়তা প্রদানের পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব।

বিকল্প ব্যবস্থা :যে কোনো সংকটাপন্ন অবস্থায় অ্যাপসটির জরুরি মেন্যুতে ক্লিক করার পরিস্থিতি না থাকলে ফোনের পাওয়ার বাটনে চেপেও অভিযোগ করা যায়। উদাহরণস্বরূপ যদি ফোনটি কোনো নারীর ভ্যানিটি ব্যাগের ভেতর থাকে এবং তার পক্ষে ব্যাগ খুলে ফোন বের করে মেন্যু প্রেস করা কঠিন। এ ক্ষেত্রে মেন্যু বের করে ক্লিক করার প্রয়োজন নেই। পরপর চারবার পাওয়ার বাটন প্রেস করলেই ফোনে ভাইব্রেশন হবে। এর পর পঞ্চমবার পাওয়ার বাটন প্রেস করার সঙ্গে সঙ্গে ফোনের ফ্রন্ট ক্যামেরা ও ব্যাক ক্যামেরা অন হয়ে যাবে এবং উভয় দিকের ছবি উঠতে থাকবে। ঘটনার ছবি, অডিওসহ জিপিএস লোকেশন জয় মোবাইল অ্যাপস সেন্টারের সার্ভারে প্রাপ্তির পাশাপাশি তিনটি এফএনএফ এবং সংশ্নিষ্ট পুলিশ প্রশাসনের কাছে পৌঁছে যাবে।

ডাউনলোড পদ্ধতি :জয় মোবাইল অ্যাপসের ডাউনলোড পদ্ধতি একেবারেই সহজ। যে কোনো অ্যান্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেমসম্পন্ন ফোন থেকে গুগল প্লে স্টোরে 'ঔড়ু ১০৯' লিখে অ্যাপসটি ইন্সটল করা যায়। ইন্সটল করার পর নাম, ই-মেইল নম্বর ও জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর প্রদান করে পরবর্তী অপশনে গিয়ে চার ডিজিটের একটি পিন নম্বর সেট করতে হয়। নিরাপত্তা প্রশ্নগুলো থেকে যে কোনো একটি প্রশ্নের উত্তর দিলেই ইনস্টলেশন সম্পন্ন হয়ে যায়।

অভিযোগের অপশন : জয় মোবাইল অ্যাপসটিতে দু'ভাবে অভিযোগ করার অপশন রয়েছে। যেমন 'জরুরি অবস্থা' ও 'লিখিত অভিযোগ'। সরাসরি মেন্যু থেকে 'জরুরি অবস্থা' আইকন প্রেসের মাধ্যমে এবং 'লিখিত অভিযোগ' অংশ থেকে অনলাইনে লিখিত অভিযোগ করা যায়। এই অ্যাপসটি থেকে অভিযোগকারীর অবস্থান শনাক্তকরণ, ছবি ও অডিও সংগ্রহের জন্য ইন্টারনেট সংযোগের প্রয়োজন হয়। ইন্টারনেট সংযোগ না থাকলে শুধু মেসেজ পাওয়া যায়, তবে লোকেশন শনাক্তকরণ সম্ভব হয়ে ওঠে না। লিখিত অভিযোগ করার ক্ষেত্রে অভিযোগের ধরন বাছাই করে বিবরণসহ অভিযোগ করা যাবে। এ ছাড়াও সংযুক্ত করুন অপশনে ছবি এবং অডিও সংযুক্ত করে তা প্রেরণের ব্যবস্থাও রয়েছে।

অন্যান্য জরুরি সেবার সঙ্গে লিঙ্ক স্থাপন :মাল্টি সেক্টোরাল প্রকল্পের পরিচালকের কাছ থেকে জানতে পেলাম, পুলিশ সদর দপ্তরের ৯৯৯ এবং তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের ৩৩৩ জরুরি সেবাগুলোর সঙ্গে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এমওইউ স্বাক্ষরের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। আমি মনে করি, যেহেতু জয় মোবাইল অ্যাপসে ঘটনার অডিও এবং ভিডিও রেকর্ডিং থাকে, সেহেতু পুলিশ সদর দপ্তর এবং আইসিটি বিভাগের সঙ্গে কার্যকর লিঙ্কটি স্থাপনের মাধ্যমে এর সফল বাস্তবায়ন করা সম্ভব।

জয় মোবাইল অ্যাপস থেকে প্রত্যাশা :'জয়' মোবাইল অ্যাপসটি নারী, শিশু বা যে কোনো ব্যক্তির সুরক্ষা দিতে একটি রিভলবারের মতো কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আমার বিশ্বাস। অ্যাপসে ধারণকৃত দু'একটি ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হলে এবং এর ব্যাপক প্রচার করা হলে অপরাধীরা এ ধরনের ঘটনা ঘটাতে সাহস করবে না বলে মনে করি। ধরা যাক, একটি চলন্ত বাসে বা রাস্তায় নারী-শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে। আক্রান্ত ব্যক্তি বা ঘটনার সময় উপস্থিত যে কোনো সচেতন ব্যক্তি তার মোবাইল ফোন থেকে জয় মোবাইল অ্যাপসের মাধ্যমে ঘটনার ভিডিও চিত্র ধারণ করে সেন্টারে পাঠিয়ে দিলেন। লোকেশন, ঘটনার ছবি, অডিওসহ অপরাধীকে শনাক্ত করে দ্রুত শাস্তির আওতায় আনা যাবে। এর ফলে নারী ও শিশুদের রাস্তায় চলাচলে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হবে না। জয় মোবাইল অ্যাপস কার্যকর প্রয়োগের মাধ্যমে নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুর সুরক্ষা প্রদানের পাশাপাশি তাদের ক্ষমতায়নে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাবে।

সাবেক সিনিয়র সচিব, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার