ঢাকা শুক্রবার, ২৩শে আগস্ট ২০১৯, ৯ই ভাদ্র ১৪২৬


দূর্নীতিতে ধুঁকছে দেশের একমাত্র টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়


১৮ জানুয়ারী ২০১৯ ১২:৩৮

আপডেট:
১৮ জানুয়ারী ২০১৯ ২০:১০

ফাইল ছবি

দূনীতিতে ধুঁকছে দেশের একমাত্র টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়। গত ৪ বছর আগে বর্তমান ভিসি নিয়োগের পর থেকে একের পর এক দূর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা ও স্বজনপ্রীতিতে ডুবতে বসেছে এ বিশ্ববিদ্যালয়টি। স্বজনপ্রিতী, নিয়োগ বাণিজ্যে মুখ থুবড়ে পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষা কার্যক্রমও। পূর্বে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ৩৬০ জন ছাত্রের বিপরীতে যেখানে ফরম বিতরণ হতো ১৭ থেকে ২২ হাজার সেখানে এখন ৬০০ জনের জন্য ফরম বিক্রি হচ্ছে ৫ থেকে ৭ হাজার। এ কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য শিক্ষক কর্মচারীদের মাঝে ব্যাপক ক্ষোভেরও সঞ্চারও হয়েছে। তারা বলছেন, মূলত ভিসি ইঞ্জি: মাস্উদ আহমেদের একের পর এক স্বেচ্ছাচারিতার কারণে এ বেহাল। বর্তমান ভিসির বিরুদ্ধে এ সকল অভিযোগ লিখিত আকারে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি), দূর্নীতি দমন কমিশনসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থায় প্রেরণ করা হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বিগত ২০১৫ সালে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে অবস্থিত দেশের একমাত্র টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি হিসেবে নিয়োগ পান ইঞ্জি: মাস্উদ আহমেদ। এরপর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক গতিপথ যেন বন্ধ হয়ে যায়। একের পর এক নিয়োগ, নিয়োগের নামে স্বজনপ্রীতি, বিএনপি জামায়াতপন্থি শিক্ষক কর্মকর্তাদের বিশেষ সুবিধা দেয়া, অবসরের পরেও অযোগ্য ব্যক্তিদের পূণরায় চুক্তিতে নিয়োগ দেয়া সর্বপরি শিক্ষার মানের নিম্নগতি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কিন্তু ভিসির একগুয়েমী ও স্বেচ্ছাচারীতার কারনে কেউ কোন কিছু বলতে পারেনা।

নিয়োগে দূর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি : অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ৪ বছরে বর্তমান ভিসি প্রায় ২০০ জনকে নিয়োগ দিয়েছেন। বেশির ভাগ নিয়োগিই গত তিন মাসে তড়িঘড়ি করে ভিসির মেয়াদপূর্তির আগে সম্পূর্ণ করা হয়েছে। এই নিয়োগে কোটি টাকার বাণিজ্য করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এদের মধ্যে ৩০ জন সরাসরি ভিসির কোন না কোন ভাবে আত্নীয় হন। এছাড়াও ভিসির সঙ্গে সখ্যতার কারণে অন্যান্য শিক্ষক কর্মকর্তার আত্নীয় স্বজন রয়েছেন আরো প্রায় ৫০ জন। দেখা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের একাউন্টস অফিসার পদে বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়। শারমিন নামের এক নারীর ওই পদে নিয়োগের জন্য ২৮ আবেদনের ২৫টি বাতিল করে তাদেরই আত্নীয় স্বজনের ৩টি আবেদন রাখা হয়। পরবর্তীতে ৩টি থেকে শারমিনকে একাউন্টস অফিসার পদে নিয়োগ দেয়া হয়। এরপর তার জন্য আড়াই বছরের মধ্যে সহকারী পরিচালক পদে বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়। ওই বিজ্ঞপ্তির বিপরীতে শারমিন আবেদন করলে নিয়োগ বোর্ড তার আবেদন অযোগ্য ঘোষণা করেন। কিন্তু এর এক সপ্তাহের মধ্যে কোন নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে তাকে সহকারী পরিচালক পদে আপগ্রেডেশন দেয়া হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভিসির বন্ধু হিসেবে পরিচিত ড্রাফট ম্যান ফজলুল হককে নির্বাহি প্রকৌশলীর মত গুরুত্বপূর্ন পদে বার বার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এছাড়াও বি. এসসি. ইন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং পরীক্ষায় প্রথমবার অকৃতকার্য আব্দুস সাত্তারকে পিডি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তিনি দুর্নীতি দমন কমিশনের অভিযুক্ত একজন কর্মকর্তা। বিশেষত তাদের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল প্রোজেক্টে দুর্নীতির ষোলকলা পূর্ণ করার জন্য এ নিয়োগ দেয়া হয়।

জামায়াত বিএনপি পন্থি শিক্ষকদের বিশেষ সুবিধা : অভিযোগ রয়েছে ভিসি জামায়াত বিএনপি পন্থি শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বিশেষ সুবিধা দিয়ে থাকেন। দেখা যায় ততকালীন পাকিস্থান পন্থি ইনকিলাব পত্রিকার চাকুরিজীবীর সন্তান জামাতপন্থি মনিরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান রেজিষ্ট্রার। তিনি বিএনপি পন্থি ডেপুটি রেজিষ্ট্রার শরিফুল ইসলামের উপর নির্ভর করে নাম সর্বস্ব অফিস করেন। রেজিষ্টারের ছেলে শায়েখ মুনীর, টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং এ ভর্তি হয় পোষ্য কোটায়। শায়েখ মুনীরের এম.এসসি. ডিগ্রী না থাকা সত্বেও তাহাকে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেয় এবং অনিয়মতান্ত্রিক ভাবে বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব দিয়ে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ভোগ করার সুযোগ দেয়। এছাড়া ভিসির যোগদানের পরপরই চিহ্নিত জামাত বিএনপি পন্থি শিক্ষকদের বৃত্তি দিয়ে উচ্চ শিক্ষার জন্য তুরস্কে পাঠান। বৃত্তি দেয়ার পরও ওই সকল শিক্ষকদের বেতনভাতা দেয়া হয়। কিন্তু অন্য অনেক শিক্ষকদের বেলায় তা করা হয় নাই।
অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপক পদে নিয়োগের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে প্রথম সংবিধির ৬ এর ১ এর (ঘ) এবং ৬ এর (৬) ধারা অগ্রায্য করে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মোঃ মাসুমকে একমাত্র জামাত পন্থি হওয়ায় ভিসির মেয়াদ শেষ হবার পূর্বে গত বছরের ২২ ডিসেম্বর সিন্ডিকেটের ৫১তম সভায় তড়িঘড়ি করে সহযোগী অধ্যাপক পদে আপগ্রেডেশন দেয়া হয়। এতে করেও ভিসির বিরুদ্ধে ব্যাপক ক্ষোভ রয়েছে।

টাকা তসরুপ : ২০১৫ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে ল্যাব ও হল নির্মানের জন্য প্রায় ৮ কোটি টাকা আসে। কিন্তু কোন কিছু নির্মান করা হয়নি। তাছাড়া অসংখ্য অনুদান রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ে। ব্যাংক থেকে ওই টাকার সুদ উত্তোলন করা হয়, যার কোন হিসাব নেই। তাছাড়া ডেডো এর মহাপরিচালকের অভিযোগে দেখা যায় যে টেক্সটাইল বিশ^বিদ্যালয়ের টেষ্টিং এর পরিচালক শেখ মোমিনুল আলম এবং ভিসি যোগসাযসে ত্রিশ লাখ টাকা টেষ্টিং ফান্ডে জমা না দিয়ে নিজেদের মধ্যে ভাগ বাটোয়ারা করে, যা তদন্তের বিষয়টি ইউজিসিতে আছে।

একাডেমিক কার্যক্রমে ধস : চার বছরে ৪৮টি বিষয়ের মধ্যে ৩৬টি বিষয়ে ফেল নিয়ে লেভেল-৪ টার্ম-২ তে উত্তীর্ণ হয়েছে শিক্ষার্থীরা। প্রত্যেকটি সেমিষ্টারের এই ধরনের পরীক্ষার রেজাল্ট চিত্র দেখা যাচেছ। শিক্ষক কর্মকর্তারা বলছেন, মূলত ভিসির দূর্নীতি নানা স্বজনপ্রীতির কারণে দিন দিন শির্ক্ষর্থীরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচার প্রচারনাও নেই। অনেকেই জানেইনা টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। শিক্ষার্থীদের মাঝে এটি জানানোরও দরকার আছে। কিন্তু বর্তমান ভিসির এসব বিষয়ে কোন পদক্ষেপ নাই।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমান ভিসির মেয়াদ আছে ১ মাস । কিন্তু তিনি দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য তদবির করলেও তার অবসর যাওয়ার সময় আছে মাত্র এক বছর ৩ মাস। ভিসির এসব কান্ডে বিশ্ববিদ্যালয়টির অন্যন্য শিক্ষক কর্মকর্তাদের মাঝে ব্যাপক ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। শিক্ষার সুষ্ঠ পরিবেশ আর দূর্নীতির হাত থেকে রক্ষা করতে দ্রুত ভিসি পরিবর্তন করে সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিকে ভিসি নিয়োগের পরামর্শ দিয়েছেন শিক্ষক কর্মকর্তারা।

এদিকে ভিসির এ সকল নিয়োগ দূর্নীতিতে নিয়ে তার মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন ধরেননি।

নতুনসময়/আইএ