ঢাকা বুধবার, ১৯শে ফেব্রুয়ারি ২০২০, ৮ই ফাল্গুন ১৪২৬


বিয়ের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ধর্ষণ এবং একজন কলঙ্কিনী সুমীর প্রতি আমাদের অঙ্গীকার


৭ ডিসেম্বর ২০১৯ ২০:২৯

আপডেট:
১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০ ০৬:২১

একই প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত থাকার সুবাদে চা শ্রমিক বাবামায়ের কন্যা সুমী'র (ছদ্মনাম) সাথে পরিচয় এবং পরবর্তী সময়ে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে মৌলভীবাজারের খেজুরছড়া এলাকার সমীর গোয়ালার পুত্র বখাটে যুবক প্রহর গোয়ালার (২২)। উপরে উপরে ভালবাসার অভিনয় করে গেলেও প্রহরের আসল উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন। হৃদয়ঘটিত অনুরাগ নয়, অষ্টাদশী সুমীর প্রতি দৈহিক কামনাবাসনাই ছিল সুদর্শন যুবক প্রহরের মোক্ষ। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী বিয়ের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে অসংখ্যবার শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করতে সুমীকে বাধ্য করেন প্রতারক প্রেমিক প্রহর। বন্ধুর বাসা, চা বাগান এমনকি নিজেদের বাড়িতেও চলে রাত্রিযাপন। এভাবে অনবরত শারীরিক মিলনের জেরে মে মাসের দিকে এক পর্যায়ে অপ্রত্যাশিতভাবে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন সুমী। নিরুপায় সুমী পূর্বপ্রতিশ্রুতি মোতাবেক বিয়ে করার অনুরোধ জানান প্রহরকে। প্রহরও রাজি, কিন্তু শর্ত একটাই- আগে পেটের বাচ্চা নষ্ট করে আসো। অনিচ্ছাসত্ত্বেও শুধু প্রেমিকের দেওয়া শর্ত পূরণের খাতিরে সেটিও সম্পন্ন করেন সুমী।

কিন্তু এর পর থেকেই ১৮০ ডিগ্রি এঙ্গেলে বদলে যান প্রহর। সুমীকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে গিয়ে অন্যত্র বিয়ের আয়োজনও চলতে থাকে। প্রহরের বাবা সুমীকে পুত্রবধূ হিসেবে গ্রহণ করা সম্ভব নয় জানিয়ে মেয়েকে অন্যত্র বিয়ে দিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দেন। প্রয়োজনে সে বিয়ের সকল খরচ প্রহরের বিত্তশালী বাবা বহন করবেন। এদিকে সুমীর সাথে প্রহরের শারীরিক সম্পর্ক, গর্ভধারণ ও গর্ভপাতের ঘটনা চা বাগানবাসীদের নিকট তখন টক ঝাল মিষ্টি এক আলোচনার খোরাক। উঠতে বসতে সকলের তীর্যক দৃষ্টি, লোকনিন্দা- হাস্যরসে প্রতিমুহূর্তে জেরবার হতে থাকেন সুমী। সবচেয়ে বড় কথা, জীবনের কঠিনতম এ দিনগুলোতে জন্মদানকারী বাবামাকেও পাশে পেতে ব্যর্থ হন সুমী। মানসম্মান তো গেছেই। কালি আরো বেশি ছড়িয়ে পড়বার আগে মেয়েকে অন্য কোথাও পাত্রস্থ করতেই তারা এখন আগ্রহী।

কিন্তু সব হারিয়ে নিঃস্ব সুমী বিষয়টা একটু ভিন্নভাবে ভাবতে চাইলেন। এত বড় অন্যায়, এত মর্মান্তিক প্রতারণাকে এমনি এমনি পার পেতে দেওয়া যায় না। লোকসমাজে কলঙ্কিনী হয়ে তিলে তিলে মরার বদলে সাহসী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন তিনি। লোকনিন্দার হাত থেকে বাঁচতে নিজ বাড়ি ছেড়ে অন্য এলাকায় এক বান্ধবীর বাড়িতে এসে আশ্রয় নেন। তারপর থেকে শুরু হয় বিভিন্ন ব্যক্তি সংস্থার নিকট ধর্ষক প্রহরের বিচারের দাবিতে একাকী এক মেয়ের নিঃসঙ্গ লড়াই। গতকাল রাতে এই অন্যায়ের প্রতিকার চাইতে আমাদের ক্যাম্পে এসেছিলেন সুমি। তার কাছ থেকে সব শুনে, তার ন্যায্য - সাহসী লড়াইয়ের কথা জেনে আমি তার বিষয়টা সিরিয়াসলি দেখার সিদ্ধান্ত নিই।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা আঁচ করতে পেরে সুর বদলে ফেলেন প্রহরের পরিবার। তারা যেকোনো মূল্যে সমঝোতা চান। কিন্তু প্রতারক প্রেমিকের নিষ্ঠুর খেলার শিকারে পরিণত হওয়া এক সময়ের সরলা বালিকা সুমী এবার লোহমানবীর ভূমিকায়। এক বিশ্বাসঘাতকের ঘরনি হবার আর কোনরকম সাধ তার নেই। ধর্ষকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিই এখন তার একমাত্র চাওয়া। এরই ধারাবাহিকতায় আজ দুপুরে শ্রীমঙ্গল থানায় প্রহরকে একমাত্র আসামি করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ ( সংশোধিত ২০০৩) এর ৯(১) ধারায় সুমী কর্তৃক মামলা দায়েরের প্রেক্ষিতে বিকেল ৩ টায় অভিযুক্ত ধর্ষক প্রবাসকে গ্রেপ্তার করি আমরা।

প্রিয় সুমী! কলঙ্ক রটিয়ে আপনার জীবনকে বিষিয়ে তোলা সমাজ বা জন্মদানকারী পিতামাতার কাছে আপনার সম্মানের মূল্য থাকুক বা না থাকুক, আমাদের কাছে আপনি সম্মানের স্থানেই রয়েছেন। আপনার উপর সংঘটিত অন্যায়কে সবাই অগ্রাহ্য করলেও আমাদের কাছে আপনার এই অপমান, আপনার এই ন্যায়বিচার প্রাপ্তির লড়াই গুরুত্বপূর্ণই রয়েছে। একজন নারী এবং একজন মানুষ হিসেবে আপনার প্রতি শ্রদ্ধাবোধের জায়গা থেকে আমরা সবসময় আপনার পাশে আছি এবং আপনার পরবর্তী জীবনেও যেকোন বিপদে -দুর্যোগে আপনার পাশে থাকার অঙ্গীকার করছি। আশা করি, অমানিশার ঘোর আঁধার পেরিয়ে সুন্দর একটি জীবনই লাভ হবে আপনার।

শামীম আনোয়ার

এএসপি (র‍্যাব), ৩৪ তম বিসিএস (পুলিশ) ক্যাডার