ঢাকা শুক্রবার, ৬ই মার্চ ২০২৬, ২৩শে ফাল্গুন ১৪৩২


দুই শিক্ষক ও এক কর্মকর্তার দীর্ঘদিনের পরিকল্পনায় খুন হন ইবি শিক্ষিকা


৬ মার্চ ২০২৬ ১০:৫৮

সংগৃহীত

কুষ্টিয়ায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজ দফতরে শিক্ষক আসমা সাদিয়া হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় চারজনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেছেন তার স্বামী। এতে ঘটনার সময় তার অফিসকক্ষ থেকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার কর্মচারী ফজলুর রহমানকে এক নম্বর আসামি করা হয়েছে। এছাড়া আসমার সহকর্মী দুই শিক্ষক ও এক সহকারী রেজিস্ট্রারকেও আসামি করা হয়।

 

মামলায় আসামি করা দুই শিক্ষক হলেন সমাজকল্যাণ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শ্যাম সুন্দর সরকার ও হাবিবুর রহমান। শ্যাম সুন্দর আগে আসমা সাদিয়ার বিভাগের সভাপতি ছিলেন। অপর আসামি বিশ্বজিৎ কুমার বিশ্বাস উম্মুল মোমেনিন আয়েশা সিদ্দিকা হলের সহকারী রেজিস্ট্রার। কিছুদিন আগে সমাজকল্যাণ বিভাগ থেকে তাকে সেখানে বদলি করা হয়।

 

বুধবার (৪ মার্চ) দিবাগত রাতে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানায় ওই মামলা করেন আসমার স্বামী মুহা. ইমতিয়াজ সুলতান। এজাহারে তিনি অভিযোগ করেন, ওই দুই শিক্ষক ও এক কর্মকর্তার দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা ও নির্দেশে কর্মচারী খন্দকার ফজলুর রহমান আসমা সাদিয়াকে হত্যা করেছেন। মামলায় অজ্ঞাত ব্যক্তিদেরও আসামি করা রয়েছে। তবে সংখ্যা উল্লেখ করা হয়নি।

 

মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কুষ্টিয়া পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অবস) ফয়সাল মাহমুদ। তিনি বলেন, মামলায় চারজন আসামির নাম উল্লেখ করা হয়েছে। আসামিদের ধরতে ও আইনি পদক্ষেপ নিতে পুলিশ কাজ করছে।

 

মামলায় বাদী উল্লেখ করেছেন, ২০১৮ সালে ফজলুর রহমান সমাজকল্যাণ বিভাগের বিভাগীয় তহবিল থেকে অফিস সহায়ক পদে নিয়োগ পান। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আসমা সাদিয়া বিভাগের সভাপতি হন। আগের সভাপতি শ্যাম সুন্দর তার সময়ের বিভাগের আয়-ব্যয়ের হিসাব আসমাকে বুঝিয়ে দেননি। সহকারী রেজিস্ট্রার বিশ্বজিৎ কুমার আসমা সাদিয়াকে বলেন, তারা যেভাবে বলবেন এবং কাগজ সামনে ধরবেন, সেখানে তাকে শুধু স্বাক্ষর করতে হবে। সে সময় আসমা বিভাগের টাকা স্বচ্ছতার ভিত্তিতে খরচ ও অপব্যবহার করা যাবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। তখন থেকেই আসমার সঙ্গে বিশ্বজিৎ ও শ্যাম সুন্দরের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব শুরু হয়। ফজলুসহ তিনজন মিলে বিভাগের অর্থ আত্মসাৎ ও অপব্যবহার করতেন। আসমাকে বিভিন্ন সময়ে ফজলুর অসহযোগিতা ও হেনস্তা করতে থাকে। এরপর শিক্ষক হাবিবুর রহমানের সামনে আসমাকে ফজলুর অপমানজনক শব্দ ও অশালীন আচরণ করেন,কিন্তু হাবিবুর কোনো প্রতিবাদ করেননি।

 

আরও বলা হয়, এসব ঘটনা সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন রোকসানা মিলিকে বিষয়টি মৌখিকভাবে অবহিত করেন আসমা। এ নিয়ে ডিনের নির্দেশে বিভাগে সভাও হয়েছিল। একপর্যায়ে কয়েক মাস আগে ডিনের নির্দেশে বিভাগীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও বিভাগীয় সভাপতিকে অসহযোগীতা করায় ফজলুরকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে বদলি করা হয়। বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন শিক্ষক হাবিবুর। তিনি ফজলুরকে পুনরায় সমাজ্যকল্যাণ বিভাগে আনতে আসমাকে চ্যালেঞ্জ ছোড়েন। 

 

অন্যদিকে বিভাগের অর্থ তছরুপের ঘটনায় বিশ্বজিৎকে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি বদলি করা হয়। এর পর থেকে আসমাকে সবাই মিলে হত্যার পরিকল্পনা করতে থাকেন। দুই শিক্ষক ও এক কর্মকর্তার সরাসরি প্ররোচনায় এবং নির্দেশনায় ফজলুর ধারালো ছুরি নিয়ে আসমার অফিসকক্ষে প্রবেশ করে দরজা বন্ধ করে দেন এবং হত্যা করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের এসব ঘটনা প্রায়ই স্বামীকে সাদিয়া জানাতেন বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়।

 

বুধবার দিবাগত গভীর রাতে ফজলুর রহমান সাড়া দেন। পুলিশ ও হাসপাতালের চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, তাকে ডাকলে সাড়া দিচ্ছেন। চোখ মেলে তাকাচ্ছেন। কিছু জানতে চাইলে কলম দিয়ে লিখতে পারছেন। রাতেই পুলিশের কর্মকর্তারা দুই পাতার লিখিত বক্তব্য নিয়ে গেছেন। লিখিত বক্তব্যে ফজলুর জানিয়েছেন, বিভাগীয় প্রধান (সাদিয়া) তাকে (ফজলুর) বদলি করায় এবং বেতন বন্ধ করে দেওয়ায় তার মনে ক্ষোভ তৈরি হয়। জীবন নিয়ে হতাশায় ভুগতে থাকেন। দীর্ঘ আট,নয় বছর যে বিভাগে থেকেছেন, সেখান থেকে তাকে বদলি করা এবং বেতন না দেওয়ায় তীব্র ক্ষোভ মনে দেখা দেয়। এ থেকেই ফজলুর হত্যার পরিকল্পনা করেন।

 

এবিষয়ে সহকারী অধ্যাপক শ্যাম সুন্দর সরকার বলেন, আমাদের এক সহকর্মী মারা গেছেন, এটা নিয়ে আমরা খুবই শোকাহত। তার সঙ্গে আমাদের এমন কোনো খারাপ সম্পর্ক ছিল না যে আমরা হত্যার নির্দেশদাতা। বিষয়টি তদন্তাধীন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সব কিছু ক্লিয়ার হয়ে যাবে। একজন মানুষ স্বজনহারা হয়েছেন। আমরা তো শিক্ষক, কখনো মানুষকে হত্যা করতে পারি? 

 

আসমা সাদিয়ার জানাজায় শিক্ষক হাবিবুর রহমান উপস্থিত ছিলেন। এর আগে বৃহস্পতিবার সকালে ক্যাম্পাসে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, আমি একজন মানুষ হিসেবে এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই। যদি আমি নিজেও এর সঙ্গে জড়িত থাকি, তাহলে আমি নিজেরও শাস্তি চাই। আসমা সাদিয়া রুণাকে উদ্ধারের পর বুধবার রাতে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে গিয়েছিলেন হাবিবুর।

 

উল্লেখ্য, গত বুধবার বিকেলে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজ দফতরে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতে সমাজকল্যাণ বিভাগের সভাপতি ও সহকারী অধ্যাপক আসমা সাদিয়া রুনা (৩৫) নিহত হন। একই সময় রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের কর্মচারী ফজলুর রহমানকে ওই কক্ষ থেকে (৩৫) গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। তাঁকে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্চা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। বৃহস্পতিবার আসমার লাশ কুষ্টিয়া পৌর কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।