বেনাপোল কাস্টম হাউসে ছয় মাসে রাজস্ব ঘাটতি ১,০১৩ কোটি টাকা
দেশের সর্ববৃহৎ স্থলবন্দর বেনাপোল কাস্টম হাউসে চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে প্রায় ১ হাজার ১৩ কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি দেখা দিয়েছে। আমদানি বাণিজ্য কমে যাওয়া, ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কের টানাপোড়েন, বন্দরের অভ্যন্তরীণ জটিলতা ও মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে শুল্কফাঁকি বৃদ্ধিকে এই ঘাটতির প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
কাস্টমস সূত্র জানায়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ২০২৫–২৬ অর্থবছরে বেনাপোল কাস্টম হাউসের জন্য ৮ হাজার ৩৭০ কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এর মধ্যে জুলাই থেকে ডিসেম্বর—এই প্রথম ছয় মাসে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ হাজার ১৩৩ কোটি টাকা। কিন্তু এই সময়ে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৩ হাজার ১২০ দশমিক ৫ কোটি টাকা। ফলে ছয় মাসেই ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ১৩ কোটি টাকা।
মাসভিত্তিক হিসাবে দেখা যায়, জুলাই মাসে ৫০৮ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয় ৫৪৪ দশমিক ৪ কোটি টাকা। তবে পরের মাসগুলোতে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি। আগস্টে ৪৯৩ কোটির বিপরীতে আদায় ৪৪৭ দশমিক ৯৩ কোটি, সেপ্টেম্বরে ৬০১ কোটির বিপরীতে ৫১৩ দশমিক ৫৮ কোটি, অক্টোবরে ৬৪৫ কোটির বিপরীতে ৪৪৯ দশমিক ২৮ কোটি, নভেম্বরে ৭৫৫ কোটির বিপরীতে ৫৬৪ দশমিক ৪১ কোটি এবং ডিসেম্বরে ১ হাজার ১৩১ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে ৬০০ দশমিক ৮১ কোটি টাকা। যদিও প্রথমার্ধে ঘাটতি থাকলেও অর্থবছরের শেষ দিকে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন কাস্টমস কর্মকর্তারা।
কাস্টমসের কর্মকর্তারা জানান, সাম্প্রতিক সময়ে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে টানাপোড়েন সৃষ্টি হওয়ায় আমদানি–রপ্তানি বাণিজ্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বেনাপোল বন্দরে। পাশাপাশি শিল্পের কাঁচামাল, ইলেকট্রনিকস সামগ্রী, যন্ত্রাংশ ও কেমিক্যালের মতো উচ্চ শুল্কযোগ্য পণ্যের আমদানিও কমেছে। এতে শুল্ক, ভ্যাট ও অন্যান্য কর আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
তবে ব্যবসায়ীরা মনে করেন, শুধু আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নয়, অভ্যন্তরীণ সমস্যাও রাজস্ব কমার জন্য দায়ী। তাঁদের ভাষ্য, ২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাণিজ্য নিরাপত্তায় দুর্বলতার সুযোগে কিছু অসাধু চক্র পণ্য পাচার করে শুল্কফাঁকি দিচ্ছে। আবার কয়েকটি পণ্যের ওপর আমদানি নিষেধাজ্ঞা থাকায় বন্দরের কার্যক্রমও সীমিত হয়ে পড়েছে। এর সঙ্গে কাস্টমস ও বন্দরের ভেতরের অনিয়ম, জটিলতা ও অতিরিক্ত শুল্কায়নের অভিযোগ যুক্ত হওয়ায় অনেক আমদানিকারক বেনাপোল বন্দর ব্যবহার কমিয়ে দিয়েছেন।
আমদানিকারক হাবিবুর রহমান বলেন, বেনাপোল বন্দর দিয়ে বছরে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু নিরাপত্তাজনিত দুর্বলতা ও আমদানি নিষেধাজ্ঞার কারণে রাজস্ব আদায় মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
বেনাপোল সিএন্ডএফ এজেন্ট ব্যবসায়ী সংগঠনের দপ্তর সম্পাদক মোস্তাফিজ্জোহা সেলিম বলেন, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ না থাকায় অনেক ব্যবসায়ী বিকল্প বন্দর ব্যবহার করছেন। পণ্যের দ্রুত খালাস ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা গেলে আমদানি ও রাজস্ব আয় বাড়তে পারে।
বেনাপোল সিএন্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি মফিজুর রহমান স্বজনের অভিযোগ, কাস্টমসের নিচের স্তরের কিছু কর্মকর্তা অতিমূল্যায়নের মাধ্যমে আমদানিকারকদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছেন। এতে উচ্চ শুল্কযোগ্য পণ্য অন্য বন্দর দিয়ে আমদানি হচ্ছে এবং বেনাপোলে রাজস্ব কমছে।
বেনাপোল স্থলবন্দর সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে এ বন্দর দিয়ে আমদানি হয়েছে প্রায় ১০ লাখ ১৫ হাজার ৫২০ মেট্রিক টন পণ্য। আগের অর্থবছরে মোট আমদানি ছিল ১৮ লাখ ৬৩ হাজার ৪২০ মেট্রিক টন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আমদানি বাণিজ্যে বড় ধরনের পতন ঘটেছে।
বেনাপোল স্থলবন্দরের পরিচালক (ট্রাফিক) শামিম হোসেন জানান, স্বাভাবিক সময়ে যেখানে দৈনিক ৬০০ থেকে ৭০০ ট্রাক পণ্য আমদানি হতো, বর্তমানে তা নেমে এসেছে প্রায় ২৫০ ট্রাকে। এতে রাজস্ব আদায়ের পাশাপাশি শ্রমিক ও পরিবহন খাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
এ বিষয়ে বেনাপোল কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার রাহাত হোসেন বলেন, শুল্কফাঁকির সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে জরিমানাসহ আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। শুল্কায়ন প্রক্রিয়া সহজ করা ও দ্রুত পণ্য খালাস নিশ্চিত করতে কাজ চলছে। আশা করা যাচ্ছে, অর্থবছরের শেষ দিকে রাজস্ব আদায়ে কিছুটা হলেও ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব হবে।
