ঢাকা সোমবার, ১৯শে আগস্ট ২০১৯, ৫ই ভাদ্র ১৪২৬


ভূয়া সার্টিফিকেটের কারবারি ডা. সালাম


২০ জানুয়ারী ২০১৯ ১৯:০৪

আপডেট:
১৯ আগস্ট ২০১৯ ১৫:০৩

ডা. সালাম

ভূয়া মেডিকেল সার্টিফিকেট দিয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েলে অসম্ভব দক্ষ কক্সবাজারের ডা. আব্দুস সালাম। টাকার বিনিময়ে ভূয়া সার্টিফিকেট দিয়ে মামলায় যেকোন একটি পক্ষকে জিতিয়ে দেয়ার ‘ঠিকাদারী’ নেন এই চিকিৎসক। শুধু তাই নয়, সরকারি বনভূমি আর জমি দখলেও তিনি সিদ্ধহস্ত। আর একারণেই একজন চিকিৎসক হয়েও পরিবেশ ও বন সংরক্ষন আইনে ২২ টি মামলার আসামী তিনি। বাস কারেন আলিশান ফ্ল্যাটে, ঘুরে বেড়ান দামী গাড়িতে। কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের প্রভাসক হিসাবে কর্মরত আব্দুস সালাম স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন প্রাইভেট চেম্বারে রোগী দেখা, ভূয়া সার্টিফিকেট বাণিজ্য, সরকারি/ব্যাক্তি মালিকানাধীন জমি আর বনাঞ্চল দখল করে বেড়াতে। পুলিশ হাসপাতালের ভিজিটিং কনসালটেন্ট পরিচয়ে হুমকি ধামকি দিয়ে বসেন নিরীহ মানুষকে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে চিকিৎসক আব্দুস সালাম সেভরন ক্লিনিক্যাল ল্যাবে একটি চেম্বারে রোগী দেখেন। তার বিরুদ্ধে টাকার বিনিময়ে ভুয়া চিকিৎসা সার্টিফিকেট দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তিনি কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের প্রভাষক পদে কর্মরত। কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তিনি কোন রোগী দেখেন না। কিন্তু বাইরের বিভিন্ন চেম্বারে রোগী দেখেন নিয়মিত। তার কাজই হচ্ছে ভুয়া সার্টিফিকেট দেওয়া। এসব ভুয়া সার্টিফিকেট দিয়ে লোকজন প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা করে থাকেন। তার বিরুদ্ধে বর্তমানে ২২ টি মামলা রয়েছে পরিবেশ ও বন সংরক্ষন আইনে। এছাড়া তার বিরুদ্ধে সুস্থ ব্যক্তিদের অসুস্থ বা আহত দেখিয়ে ভুয়া সার্টিফিকেট বানিজ্যের অভিযোগসহ বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনেও অভিযোগ রয়েছে। আদালত থেকে তার বিষয়ে তদন্ত করারও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

আব্দুস সালাম নামের ওই চিকিৎসক কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক হলেও স্থানীয় শেভরন ক্লিনিক্যাল ল্যাব নামে একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চিকিৎসা সার্টিফিকেট দেওয়ার প্রতিষ্ঠান খুলে বসেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। প্রতিপক্ষকে বিভিন্নভাবে ঘায়েল করতে মারপিটে জখম হওয়ার চিকিৎসা সংক্রান্ত যাবতীয় সার্টিফিকেট দিয়ে থাকেন ডাঃ আব্দুস সালাম। ইতোমধ্যে তার দেয়া ভুয়া সার্টিফিকেটে এক প্রবাসীর বিরুদ্ধে তার সাবেক শাশুড়ী চট্টগ্রাম আদালতে একটি মামলা করেছেন। এর আগে আরেক ব্যক্তিকে মারপিটের ঘটনায় দেয়া সার্টিফিকেটটি ভুয়া ছিল বলে পুলিশের তদন্তেও বেরিয়ে আসে। ভূয়া সার্টিফিকেট দেওয়ার অভিযোগে ওই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের বরাবারে লিখিত অভিযোগ করেছে ভুক্তভোগী মাহবুবুর রহমান।

মাহবুবুর রহমান জানান, তিনি দীর্ঘদিন ধরে সৌদি প্রবাসী। বিয়ে করার উদ্দেশ্যে দেশে ফিরলে আপন খালা আয়েশা খানমের মেয়ে রুবিনা খানমকে তাদের পরিবার থেকে তার জন্য পছন্দ করা হয়। রুবিনা তখন চট্টগ্রামে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ত। পারিবারিকভাবে ২০১৬ সালের ৭ অক্টোবর বিয়ে হওয়ার পর রুবিনা খানমকে তাদের বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। কিন্তু বিয়ের দিন থেকেই পারিবারিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে রুবিনার সঙ্গে তার দ্বি-মত তৈরি হয়। বিয়ের ১০ দিন পর ১৭ অক্টোবর কাউকে কিছু না জানিয়ে স্বর্ণলঙ্কার ও টাকা পয়সা নিয়ে বাপের বাড়ি চলে যায় রুবিনা।
২ মাস অপেক্ষার পর রুবিনাকে আইনীভাবে ২০১৭ সালের ৫ মার্চে তালাক দেওয়া হয়। একই বছরের ২৪ আগস্ট তালাক রেজিস্ট্রি হয়। কিন্তু তালাক রেজিস্ট্রি হওয়ার আগে রুবিনা ২০১৭ সালের ৭ জানুয়ারী কক্সবাজার থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করে। অভিযোগে বলা হয়, তার কাছ থেকে জোরপূর্বক স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেয়া হয়েছে। পুলিশ পরে ওই অভিযোগের কোন সত্যতা খুজে পায়নি। আর তালাকের সঙ্গে স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়ারও কোন যোগসূত্র খুজে পায়নি। পরে রুবিনার মা কক্সবাজার শেভরন ক্লিনিক্যাল ল্যাবের চিকিৎসক ডাঃ আব্দুস সালামের কাছ থেকে চিকিৎসক সার্টিফিকেট নিয়ে ২০১৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর কক্সবাজার আদালতে নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে একটি মামলা করে।

চিকিৎসক আব্দুস সালাম একটি সাদা কাগজে মেডিকেল সার্টিফিকেটে মাহবুবের সাবেক স্ত্রী রুবিনার শরীরে বিভিন্ন আঘাতের কথা উল্লেখ করে নোট দিয়েছেন ২০১৬ সালের ১৫ জানুয়ারি। কিন্তু কোন বেসরকারি হাসপাতালে কোন সার্টিফিকেট দিয়ে মামলার বিধান নেই। যদিও শেভরণ ক্লিনিক্যাল ল্যাব কোন বেসরকারি হাসপাতালও নয়। এটি একটি ডায়াগনষ্টিক সেন্টার। এখানে শুধু প্রাইভেট রোগী দেখা এবং পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হয়।
এদিকে, শেভরন ক্লিনিক্যাল ল্যাব কর্তৃপক্ষ লিখিতভাবে জানিয়েছে তাদের ওখানে কোন রোগী ভর্তি বা সার্টিফিকেট দেওয়ার বিধান নেই। এটি তারা করেনও না। শুধু রোগীদের পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হয় চিকিৎসকদের দেয়া পরমর্শে। অথচ সেই সার্টিফিকেটে তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
এর আগে রাশেদুল করিম নামের এক ব্যক্তি আব্দুর রহিমসহ এজাহারনামীয় ১২ জন ও অজ্ঞাতনামা আরো ৪/৫ জনের বিরুদ্ধে ২০১৫ সালের ২১ মে কক্সবাজার সদর মডেল থানায় একটি মামলা (জি.আর-৫০৭) দায়ের করেন। ওই মামলার সাথে ভিকটিমের একটি জখমী সনদও দাখিল করা হয়। ওই বছরের ২৮ জুলাই আদালতে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তা। পুলিশের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বাদী ও বিবাদীগণ পূর্ব পরিচিত। বাদীর উল্লেখিত তারিখ ও সময়ে ওই রকম কোন ঘটনা ঘটেনি। মূলত হয়রানী ও আর্থিক ক্ষতি করতে মামলাটি করা হয়েছে। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ২২/৭/১৫ ইং এর কেইস ডকেটের কেইস ডায়রী নং ০৯, রেজিস্টার বইয়ে জরুরী বিভাগের রেজি: নং- ই ১৫৬/১১ তারিখ ১৪/৫/১৫ ইং মূলে রাশেদুল করিম নামে কোন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়নি। এরকম কোন ব্যক্তির নামে ডাক্তারি সনদ (এম.সি) দেয়নি বলে জানান হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আর.এম.ও) ডা. সোলতান আহমদ সিরাজী। গত ২৫/৫/১৫ ইং খোদ বাদী ও ভিকটিম আদালতে একটি বিশেষ দরখাস্ত দাখিল করেছেন। সেখানে বাদী বলেছেন, চিকিৎসার জন্য তাকে হাসপাতালে নেয়া হলে ‘চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন আছে’ জানিয়ে ডা. আব্দুস সালাম সাদা কাগজে তার স্বাক্ষর নেন। পরে ওই কাগজটি এজাহার সাজিয়ে ডা. আব্দুস সালামের প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে।

এ অবস্থায় ডা. আব্দুস সালাম ও রাশেদুল করিম পরস্পর যোগসাজসে মিথ্যা মেডিক্যাল সার্টিফিকেট ব্যবহার করে আসামীদের মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে আদালতের মাধ্যমে শাস্তি প্রদানের চেষ্টা করে গুরুতর অপরাধ সংঘটন করেছে উল্লেখ করে আদালত। পরে মিথ্যা ভর্তি দেখিয়ে রোগীর নামে ‘ভূঁয়া সনদ (এম.সি)’ ও প্রতারণামূলক স্বাক্ষর নেয়ার অভিযোগে কক্সবাজারের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতের বিচারক তৌহিদুল ইসলাম গত ৮ ফেব্রুয়ারি ডা. আব্দুস সালামের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দুর্নীতি দমন কমিশন ও কক্সবাজার সিভিল সার্জনকে নির্দেশ দেন। একই সাথে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করে তা আদালতকে অবহিত করার কথাও ওই আদেশে বলা আছে। আদেশের অনুলিপি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব, দুর্নীতি দমন কমিশন সচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, কক্সবাজারের সিভিল সার্জন, দুদক চট্টগ্রাম ২ সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক ও কক্সবাজার সদর মডেল থানার ওসিকে দেয়া হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে ডা. আব্দুস সালম বলেন, রুবিনা খানম ও তার মা আয়েশা খানম এসে তাকে বলেছেন ওই তারিখে রুবিনাকে মারপিট করা করা হয়েছে এ জন্য তিনি ওই তারিখের সার্টিফিকেট দিয়েছেন। সেভরণ ক্লিনিক্যাল ল্যাবে তার একটি চেম্বার রয়েছে ওই চেম্বার থেকে তিনি এ ধরণের সার্টিফিকেট দিয়েছেন।

ডা. আব্দুস সালাম আরো বলেন, এ ধরনের সার্টিফিকেট তিনি চিকিৎসক হিসেবে দেওয়ার এখতিয়ার রাখেন। চেম্বারে রোগী ভর্তি না করেও সার্টিফিকেট দেওয়া যায়। সেখানে বর্হি:বিভাগে রোগী দেখা হয়। মারধরের রোগীরা আসলে তাদের সার্টিফিকেট দেন তিনি।

নতুনসময়/এসএ/আইএ