ঢাকা সোমবার, ১৭ই জুন ২০১৯, ৪ঠা আষাঢ় ১৪২৬


ক্যান্সার চিকিৎসায় আপনি যা খাবেন


২ সেপ্টেম্বর ২০১৮ ১৬:৪৬

আপডেট:
২ সেপ্টেম্বর ২০১৮ ১৯:০৭

ক্যান্সার নামটির সাথে এই পৃথিবীর সবাই বেশ পরিচিত। এক সময় ক্যান্সার ছিল মানুষের মনের আতঙ্ক। কারণ পূর্বে ক্যান্সার রোগের চিকিৎসা না থাকায় বেশির ভাগ রোগীই মৃত্যুবরণ করত। কিন্তু যুগের পরিবর্তনের সাথে শুরু হয়েছে ক্যান্সার রোগের চিকিৎসা।

ক্যান্সার চিকিৎসায় বর্তমানে রেডিও থেরাপি, কেমো থেরাপি, ওরাল কেমো অন্যতম। কিন্তু এসব চিকিৎসার পাশাপাশি খাবারের মাধ্যমেও ক্যান্সারের চিকিৎসা করা যায়। ব্যাপারটি আর্শ্চযজনক হলেও এটি চিরন্তন সত্য। চিকিৎসার পাশাপাশি সঠিক খাদ্যাভ্যাস একজন ক্যান্সার রোগীর নিরাময়ের কারণ হতে পারে। তবে ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগী এবং রোগীর চারপাশের মানুষদেরকে অবশ্যই স্বাস্থ্য সচেতন হতে হবে।

ক্যান্সারের কারণ ও ধরণ:

সাধারণত বিভিন্ন কারণে ক্যান্সার হতে পারে। আবার কিছু ক্যান্সার আছে যেগুলো বংশগত যেমন ব্রেস্ট ক্যান্সার, কোলন ক্যান্সার ইত্যাদি। চিকিৎসকরা অনেক সময় বলে থাকেন, মায়ের ব্রেস্ট ক্যান্সার হলে তার কন্যাদের হওয়ার সম্ভাবনা থাকে প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ। অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বেড়ে উঠা, ধূমপান, মদ্যপান, কেমিক্যাল, জিন মউিটেশন, ক্লোনিক ইনফ্লমেশেন, ওবিসিটি, হরমোনাল সমস্যা, ভাইরাস, ব্যায়াম না করা ইত্যাদি কারণে ক্যান্সার হতে পারে। শরীরের বিভিন্ন স্থানে ক্যান্সার ধরা পড়তে পারে যেমন–ব্লাড ক্যান্সার, কালারেক্টাল ক্যান্সার, কিডনি ক্যান্সার, লাং ক্যান্সার, ব্রেস্ট ক্যান্সার, প্রস্টেট ক্যান্সার, স্কিন ক্যান্সার, আনাল ক্যান্সার, ওরাল ক্যান্সার, ব্রেন ক্যান্সার, বোন ক্যান্সার, ওভারিয়ান ক্যান্সার, আরও অন্যান্য অনেক ক্যান্সার আছে।


ক্যান্সার হওয়ার পূর্বেই সাবধানতা :

শরীরে যে কোনো ধরনের বড় কোনো লক্ষণ ধরা পড়ার সাথে সাথে অবশ্যই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। যে কোনো মানুষের শরীরের ভিতরে অনেক সময় ছোট ছোট সিস্ট ধরা পড়ে। যার চিকিৎসা না করিয়ে অবহলো করলে এক সময় সিস্ট টিউমারে পরিণত হয় এবং এই টিউমার থেকে ক্যান্সার ছড়ায়। তাই ক্যান্সার হওয়ার পূর্বেই চিকিৎসা নিন।

খাবারের মাধ্যমে ক্যান্সার চিকিৎসা :

ক্যান্সার চিকিৎসায় মেডিসিনের পাশাপাশি প্রায় ৮০% রোগীর সুস্থ হয়ে যাওয়া নির্ভর করে সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও সঠিক নিয়ম অনুসরণের মাধ্যমে একজন ক্যান্সার রোগীকে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অবশ্যই নিয়ম মেনে খাবার গ্রহণ করতে হবে।

রোগীকে বেছে নিতে হবে পুষ্টিসম্মত ও স্বাস্থসম্মত সুষম খাবার৷ সাধারণত কোমোথেরাপীর সময়ে রোগীর দেহে পুষ্টি ঘাটতি হয়। শরীর কড়া হয়ে যায়। মেজাজ খিটখিটে থাকে। অতিরিক্ত মেডিসিনের জন্য কিডনিতে সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীদের পুষ্টিকর খাদ্যের পাশাপাশি বেশি করে পানি পান করতে বলা হয়। তবে কিডনি রোগীরা ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া অতরিক্তি পানি পান করা থেকে বিরত থাকুন।

ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীদের বেশি করে নরম খাবার, তরল খাবার, কম তেলে মশলাযুক্ত খাবার, এন্টিঅক্সিডেন্ট যুক্ত খাবার, আয়রন ও প্রোটিনযুক্ত খাবার খেতে হবে। স্বাস্থ্যসম্মত, টাটকা ও নির্ভেজাল খাবারই পারে ক্যান্সার রোগ প্রতিরোধ করতে।

ক্যান্সার চিকিৎসার পাশাপাশি যেসব খাবার খেতে হবে :

১. ব্রোকলি: এটি ক্রুসিফরোস গোত্রের এন্টিঅক্সিডেন্ট যা ক্যান্সারের সাথে লড়াই করে৷ বিশেষ করে ব্রেস্ট ক্যান্সারের জন্য এটি খুব ভালো।

২. গ্রীন টি: এটি দিনে এক থেকে দুবার পান করা ভাল৷ গ্রীন টিও এন্টিঅক্সিডেন্ট এবং শরীরের বিপাক ক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে।

৩. টমেটো: এটি ভিটামিন ও মিনারেলের ভাল উৎস। এটি এন্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে।

৪. গাঢ় ও সবুজ শাক সবজি: এটি ভিটামিন ও মিনারেলের ভাল উৎস এবং রোগ প্রতিরোধ করতে সক্ষম।

৫. গাজর: বেটা ক্যারোটিনের ভাল উৎস।

৬. বিটরুটের রস: ক্যান্সার কোষ ধবংস করে এবং হিমোগ্লোবিনের ভাল উৎস।

৭. ডালিম: হিমোগ্লোবিন, ভিটামিন ও মিনারেলের ভাল উৎস।

৮. সেলোরি: সেলোরি সুগন্ধিযুক্ত সবজি গোত্রে পড়ে। এটি ক্যান্সার প্রতিরোধ করতে সক্ষম।

৯. রসুন: অতিরিক্ত এন্টিঅক্সিডেন্ট যুক্ত। সহজেই ক্যান্সার কোষকে ধবংস করে।

১০. টকজাতীয় ফল: টক জাতীয় যে কোনো ফল ক্যান্সার রোগীদের জন্য ভাল।

১১. ব্ল্যাক কফি: চিনি ছাড়া ব্ল্যাক কফি ক্যান্সার প্রতরিোধ করে।

১২. ফ্যাটি মাছ: যেসব মাছে ভিটামিন ডি এবং ওমেগা-৩ আছে সেগুলো ক্যান্সারের জন্য ভাল। বিশেষ করে সামুদ্রিক মাছ।
১৩. হলুদ: ক্যান্সার চিকিৎসায় হলুদ অনেক গুরুত্বর্পূণ উপাদান। কারণ হলুদ এন্টি অক্সডিন্টে এবং এন্টিবায়োটিক উভয় হিসেবেই কাজ করে।

১৪. শিং ও মাগুর মাছ: এসব মাছে প্রচুর পরিমাণে হিমোগ্লোবিন থাকে।

১৫. দারুচিনি: সহজইে পরিপাক ও হজমযোগ্য।

১৬. লেবুর রস: হাল্কা গরম পানির সাথে লেবুর রস পান করলে এটি ক্যান্সার প্রতরিোধ করতে সক্ষম।

১৭. চম্পা কলা: শরীরের টক্সিন দূর করে এবং এতে প্রচুর পরিমাণে আয়রন ও ভিটামিন আছে।

১৮. ডিম: ওমেগা ৩, প্রোটিন এবং ক্যালসিয়ামের ভাল উৎস। একজন ক্যান্সার আক্রান্ত রোগী প্রতিদিন ২টি করে ডিম খেতে পারে।

১৯. অ্যাভোকেডা: এটি ক্যান্সার কোষকে ধ্বংশ করতে সক্ষম।
২০. ডার্ক চকলেট: ব্রেস্ট ক্যান্সার প্রতিরোধে এটি গুরূত্বর্পূণ ভূমিকা পালন করে।

ক্যান্সার চিকিৎসায় খাদ্যাভ্যাসের সঠিক নিয়ম:

ক্যান্সার চিকিৎসায় রোগীদের জন্য সর্বনিম্ন ক্যালরি প্রায় ২০০০ থাকতে হবে। রোগীকে পুষ্টিকর এবং এন্টি অক্সিডেন্টযুক্ত খাবারের পাশাপাশি বেশি পানি পান করতে হবে। পানির সর্বনিম্ন পরিমাণ হবে প্রায় ৮-১০ গ্লাস।

সুস্থ ও স্বাভাবিক মানুষকে যেমন ৬ বেলার খাবার ভাগ করে খেতে হয় তেমনি ক্যান্সার রোগীদের জন্য ৭-৮ বেলার খাবার ভাগ করে দিতে হবে। তবে এক্ষেত্রে অবশ্যই ভাল একজন নিউট্রশনিস্টের পরার্মশ নিয়ে ডায়েট চার্ট অনুযায়ী রোগীকে খাওয়াতে হবে।

যেসব খাবার ক্যান্সার রোগীদের ক্ষতি করে বা ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা আরো বাড়িয়ে দেয়:

১. অতিরিক্ত তেলে ভাজা খাবার।

২. অতিরিক্ত লবণযুক্ত ফ্রেঞ্চ ফ্রাই।

৩. অতিরিক্ত লবণ।

৪. পরিশোধিত আটা, ময়দা ও সাদা চনি। কারণ এগুলোতে ক্ষতিকর কেমিক্যাল থাকে যা স্বাস্থ্যের জন্য ব্যাপক ক্ষতিকর।

৫. গ্রীল্ড খাবার।

৬. অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার।

৭. বিভিন্ন প্রকারের ফুড অ্যাডিটিভ যেমন ফুড কালার, এসেন্স ইত্যাদি।

৮. কার্বোনেটেড বেভারেজ, প্রিজারভেটিভ খাবার, আচার।

৯. প্রসেসড ফুড, ক্যান্ড ফুড, বেকড ফুড।

১০. মাইক্রোওভেনে রান্না করা খাবার এবং ঢাকনা ছাড়া গরম করা খাবার।

১১. প্লাস্টিকের পাত্রে গরম করা খাবার।

১২. দুধ চা।

পরার্মশ:

শুরু থেকেই স্বাস্থসচতেন হন। আপনার নিজের এবং ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য সঠিক খাদ্যাভ্যাস মেনে চলুন।

 

রুবাইয়া পারভীন রীতি, নিউট্রিশনিস্ট (প্রোজেক্ট) আবুল খায়ের গ্রুপ।

 

এমএ