ভোটের মাঠে টিকটক-ফেসবুক-ইউটিউব, ডিজিটাল লড়াইয়ে মুখোমুখি বিএনপি-জামায়াত
ভোটের মাঠে টিকটক-ফেসবুক-ইউটিউব, ডিজিটাল লড়াইয়ে মুখোমুখি বিএনপি-জামায়াত
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক নির্বাচনি রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে প্রচারণার কৌশলে। মাঠ-ময়দান, জনসভা বা মিছিলের পাশাপাশি এখন লড়াইয়ের অন্যতম ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে টিকটক, ফেসবুক, ইউটিউব ও ইনস্টাগ্রামের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পর্দা। ছন্দময় গান, শর্ট ভিডিও বা রিলস, আবেগঘন সাক্ষাৎকারের পাশাপাশি ব্যঙ্গাত্মক কনটেন্টের মাধ্যমে তরুণ ভোটারদের মন জয়ের প্রতিযোগিতায় নেমেছে রাজনৈতিক দলগুলো।
গত নভেম্বরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনায় আসে একটি গান। গানের কথায় বলা হয়— 'নৌকা, ধানের শীষ আর লাঙল দেখা শেষ; দাঁড়িপাল্লাই এবার গড়বে বাংলাদেশ।'
মূলত, এই গানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির প্রতীককে প্রত্যাখ্যান করে জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত প্রতীক দাঁড়িপাল্লাকে বিকল্প হিসেবে তুলে ধরার বার্তা দেয়া হয়। গানটির নির্মাতা লন্ডনপ্রবাসী সংগীতশিল্পী এইচএএল বান্না জানান, শুরুতে এটি ঢাকার একজন প্রার্থীর জন্য তৈরি হলেও ভাইরাল হওয়ার পর বিভিন্ন প্রার্থী এটি ব্যবহার করতে শুরু করেন।
এর জবাবে বিএনপিও তাদের নিজস্ব নির্বাচনি সংগীত প্রকাশ করেছে। সেখানে বলা হয়েছে— 'আমার আগে আমরা, আমাদের আগে দেশ; ক্ষমতার আগে জনতা, সবার আগে বাংলাদেশ।'
এ ছাড়া ২০২৪ সালের আন্দোলন থেকে উঠে আসা ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির (এনসিপি) অফিসিয়াল গানও সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
মূলত, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে মাঠের প্রচারণা শুরু হয়েছে ২২ জানুয়ারি থেকে। তবে অনলাইনে এই প্রচার-যুদ্ধ চলছে অনেক আগেই। বিশেষ করে ‘জেন জি’ ভোটারদের লক্ষ্য করেই এই ডিজিটাল প্রচারণা, যারা ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনাবিরোধী ছাত্র-নেতৃত্বাধীন আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
গানের পাশাপাশি নাটকীয় শর্ট ভিডিও, নীতিনির্ভর ব্যাখ্যা, ভোটারদের আবেগি সাক্ষাৎকার ও রাজনৈতিক ব্যঙ্গচিত্রে ভরে উঠেছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো। এরই মধ্যে নির্বাচনকে ঘিরে জুলাই জাতীয় সনদের ওপর গণভোটও একটি বড় ইস্যু হয়ে উঠেছে। অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র কাঠামোর সংস্কার প্যাকেজ হিসেবে এই সনদের পক্ষে ডিজিটাল প্রচারণা চালাচ্ছে।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী প্রায় ১৩ কোটি, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭৪ শতাংশ। ডেটা রিপোর্টাল জানায়, দেশে ফেসবুক ব্যবহারকারী প্রায় ৬ কোটি ৪০ লাখ, ইউটিউব ৫ কোটি, টিকটক ৫ কোটি ৬০ লাখ এবং ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকারী ৯০ লাখের বেশি। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, মোট ভোটারের ৪৩.৫৬ শতাংশের বয়স ১৮ থেকে ৩৭ বছরের মধ্যে—যাদের বড় একটি অংশ এবার প্রথমবার ভোট দিতে যাচ্ছে।
আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ থাকায় এবারের নির্বাচন কার্যত দ্বিমুখী। একদিকে বিএনপি-নেতৃত্বাধীন জোট, অন্যদিকে জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোট যেখানে এনসিপিও রয়েছে। বিএনপি অনলাইনে নীতিগত প্রস্তাব তুলে ধরতে এবং ভোটারদের মতামত জানতে MatchMyPolicy.com চালু করেছে। অন্যদিকে জামায়াত চালু করেছে janatarishtehar.org, যেখানে জনগণের মতামতের ভিত্তিতে ইশতেহার তৈরির কথা বলা হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপি মূলত তাদের প্রতিশ্রুতি ছোট ভিডিও ও গ্রাফিক কনটেন্টে তুলে ধরছে, আর জামায়াতঘেঁষা কনটেন্টে বিএনপিকে আওয়ামী লীগের ধারাবাহিকতা হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা বেশি দেখা যাচ্ছে। পাশাপাশি ভারত-বিরোধী বার্তাও মিম ও কপি ফরম্যাটে তরুণদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে।
সবশেষে, অনলাইন প্রচারণা যতই শক্তিশালী হোক না কেন, মাঠের রাজনীতি এখনও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। অনলাইন আলোচনাই শেষ পর্যন্ত অফলাইনে ভোটের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে— বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের ক্ষেত্রে।
